প্রায় ৩০০ বছর আগে নদিয়ার কৃষ্ণনগর থেকে মাটি দিয়ে মূর্তি বানানোর দক্ষ শিল্পীরা ধীরে ধীরে কলকাতায় আসতে শুরু করেন। কৃষ্ণনগর ছিল এমন একটি এলাকা যেখানে এই মৃৎশিল্পীরা ভালো প্রশিক্ষিত ও বিখ্যাত ছিলেন। তারা কলকাতার হুগলী নদীর তীরে একটি পল্লী গড়ে তোলে, যা ‘কুমারটুলি’ নামে পরিচিতি পায়। এখানে ‘কুমর’ শব্দের মানে হলো মৃৎশিল্পী এবং ‘টুলি’ অর্থ পাড়া বা এলাকাকে বোঝায়।
কলকাতার জমিদার ও ধনী পরিবারদের দুর্গাপুজোর জন্য এই শিল্পীরা মূর্তি তৈরি শুরু করেন। ১৭৫৭ সালে নবকৃষ্ণ দেব শোভাবাজার রাজবাড়িতে দুর্গাপুজার আয়োজন শুরু করেন, তখন থেকে কৃষ্ণনগর থেকে শিল্পীদের কলকাতায় আনা হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় পটশিল্পীদের জন্য গড়ে ওঠে বসতি, যার মধ্যে কুমারটুলি ছিল প্রধান কেন্দ্র।
কুমারটুলি শুধুমাত্র একটি শিল্পকেন্দ্র নয়, এটি বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রাণকেন্দ্রও বটে। দুর্গাপুজাসহ নানান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবে কুমারটুলির তৈরি মূর্তিগুলো বাঙালির ভক্তি ও ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবেও পরিচিত। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এখানকার মূর্তি ব্যাপকভাবে রপ্তানি হয়ে থাকে। আধুনিক যুগে নারীরা কুমারটুলির শিল্পে প্রবেশ করে ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন ভাবনার সংযোজন ঘটিয়েছেন। কুমারটুলির শিল্পীরা হারিয়ে যাওয়া শিল্পকলা ও দক্ষতাকে সংরক্ষণে কাজ করছেন এবং পরিবেশ বান্ধব উপকরণ ব্যবহারের পাশাপাশি নতুন থিম প্রয়োগ করে মূর্তি নির্মাণে নতুনত্ব নিয়ে আসছেন।
প্রাচীন ইতিহাস ও পৌরাণিক সূত্র
দুর্গাপূজার সূচনা নিয়ে পার্থক্য থাকলেও, পৌরাণিক মতে দেবী দুর্গার পুজো সাধারণত বসন্তকালে হত। তবে রামচন্দ্রের রাবণ বধের জন্য ‘অকাল বোধন’ করে দুর্গার পূজা করেছিলেন, যা আজকের দুর্গোৎসবের উৎপত্তির মূল কারণ হিসেবে বিবেচিত।
বাংলায় দুর্গাপূজার সূচনা
বাংলার দুর্গাপূজার লিখিত ইতিহাসে প্রথম শুরু হয় নদিয়ার রাজা ভবানন্দ মজুমদারের হাত ধরে (১৬০১-১৬০৬ সালের মধ্যে)। অনেকে আবার বলেন, মালদহ-দিনাজপুরের জমিদার বা তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ প্রথম দুর্গাপূজা শুরু করেছিলেন।
১৭৯০ সালে গুপ্তিপাড়া গ্রামে প্রথমবারের মতো বারোয়ারী পুজো শুরু হয়, যা বারোজন বন্ধুর মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে—এই কারণেই এটির নাম রাখা হয় বারোয়ারী। কলকাতায় প্রথম সর্বজনীন বা বারোয়ারী পূজার আয়োজন হয় ১৯১০ সালে বাগবাজারে। এর পর থেকে দুর্গাপূজা ধীরে ধীরে সামাজিক ও সর্বজনীন উৎসবে রূপান্তরিত হয়। বর্তমানে কলকাতায় তিন হাজারের অধিক সার্বজনীন দুর্গাপুজোর আয়োজন হয়।
কুমারটুলির কিংবদন্তি শিল্পী গোপেনশ্বর পাল ও কুমারটুলির শিল্পীদের ঐতিহ্য
গোপেনশ্বর পাল ছিলেন কুমারটুলির অন্যতম সুপরিচিত ও সম্মানিত মৃৎশিল্পী। তিনি কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় তিনি মৃৎশিল্পের সঙ্গে পরিচয় পেয়েছিলেন পুতুল তৈরি করে। বাবা-মা হারানোর পর মামার বাড়িতে বড় হওয়া গোপেনশ্বর পাল পুতুল শিল্পে দক্ষতা অর্জন করেন। তাঁর দক্ষতা ও শিল্পসৃজনশীলতা কুমারটুলির প্রতিমা শিল্পে নতুন মাত্রা যোগ করে।
কুমারটুলির শিল্পীরা সাধারণত পারিবারিকভাবে এই কারিগরি কলাটিকে করে আসছেন। প্রতিমা তৈরিতে কাঠ, মাটি ও কাপড়ের ব্যবহার এবং শোলার অলংকরণ, রঙ প্রয়োগ, চোখ দেওয়া ইত্যাদি কর্মপদ্ধতিগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে উৎসাহিত হয়। গোপেনশ্বর পাল সহ অন্যান্য শিল্পীদের কাজেই কুমারটুলির প্রতিমাগুলো জীবন্ত এবং বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠে।
গোপেনশ্বর পালের মতো শিল্পীরা পারিবারিক ধারায় প্রথাগত পদ্ধতি বজায় রেখে নতুন থিম ও আধুনিক ভাবনাও যুক্ত করেন। তাদের কাজ শুধু দুর্গাপূজা নয়, মা কালী, সরস্বতী, লক্ষ্মীসহ অন্য দেব-দেবীর প্রতিমার ক্ষেত্রেও সমান জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কুমারটুলির শিল্পীরা প্রতিমার কাঠামো থেকে শুরু করে রঙ, অলঙ্কারে অত্যন্ত পরিশ্রম ও নৈপুণ্য দেখান।
এই শিল্পীরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে বাংলার ঐতিহ্য রক্ষায় ও প্রসারে বড় ভূমিকা রেখেছেন। কুমারটুলির শিল্প সমাজে নারীরাও প্রবেশ করেছে এবং নতুন ধারা ও সৃষ্টি নিয়ে এসেছে, যা ঐতিহ্যের সঙ্গে যুগোপযোগী।
গোপেশ্বর পালের হাত ধরে প্রতিমার ‘চাল’ অর্থাৎ মুখাবয়ব, ব্যবস্থাপনা ও অলঙ্করণে অভিনব ভাবনা আসে। তার আগে একই কাঠামোয় প্রতিমা নির্মাণের ধারা চালু ছিল, কিন্তু গোপেশ্বর পাল প্রতিমার চরিত্রে ব্যক্তিগততা, বৈচিত্র্য ও বাস্তবতার ছোঁয়া দেন।
কুমারটুলিতে বহু শিল্পীর অবদান রয়েছে—মোহন বাঁশি রুদ্র পাল, সুধীর রুদ্র পাল, শক্তি কর্মকার, নারায়ণ চক্রবর্তী, গোরাচাঁদ পাল, অলক সেন, রাখাল পাল—এঁরা প্রতিমা শিল্পে নানা নকশা, স্থাপত্য, আধুনিকতা, রঙ, অলঙ্করণ, নতুন ভাবনা ও রীতির প্রবর্তক।
শিল্পী ঐতিহ্যের বৈচিত্র্য
পরিবার-কেন্দ্রিক গুরুশিষ্য পরম্পরায় শিল্পীরা কুমারটুলিতে তাঁদের নিজস্বত্ব বজায় রেখেছেন। কারও চোখের রঙ দীঘল, কারও ঠোঁট ভরাট, কারও চালা শিবহীন—সবই এক একটি শিল্প-স্বাক্ষর।
প্রতিমা তৈরিতে কাঠ, খড়, মাটি, কাপড়, রঙ এবং শোলা ও ডাকের অলঙ্করণ—সব দিয়েই তৈরি হয় জীবন্ত মূর্তি, যেখানে শিল্পীর হাতের ছোঁয়া প্রতিটা অংশে দৃশ্যমান।
যুগে যুগে কুমারটুলির শিল্পীরা বিষয়বস্তু ও প্রকাশভঙ্গিতে পরিবর্তন এনেছেন, সমাজ ও সময়ের চাহিদা অনুযায়ী নতুন নতুন স্টাইল ও থিমের প্রতিমা নির্মাণে দক্ষতা দেখিয়েছেন
গোপেশ্বর পাল: কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণি এলাকার এই বিশিষ্ট শিল্পী ১৯১৫ সালে লর্ড কারমাইকেলের কাছ থেকে “দ্য লাইটনিং স্কাল্পচার” উপাধি অর্জন করেন তাঁর দ্রুত ও দক্ষ মূর্তি নির্মাণের দক্ষতার জন্য। ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্ব প্রদর্শনীর অংশগ্রহণের পরে, তিনি কলকাতার কুমারটুলিতে নিজের স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করেন এবং আধুনিক শিল্প ধারার বিকাশে পথিকৃৎ হিসেবে অবদান রাখেন।
মোহন বাঁশী রুদ্র পাল
কুমারটুলির অন্যতম প্রখ্যাত শিল্পী মোহন বাঁশী রুদ্র পাল। তার দুই পুত্র, সনাতন রুদ্র পাল এবং প্রদীপ রুদ্র পালও মূর্তি শিল্পে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেছেন।
গোরা চাঁদ পাল
প্রতিমা শিল্পে গোরাচাঁদ পালের নাম অত্যন্ত প্রভাবশালী। তার হাতে তৈরি প্রতিমাগুলো বিভিন্ন পূজা ও প্রদর্শনীতে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।
রাখাল পাল, গণেশ পাল, অলোক সেন, কার্তিক পাল, কেনা পাল ও প্রদ্যোৎ পাল
এসব শিল্পী কুমারটুলির প্রতিমা নির্মাণ শিল্প ও ঐতিহ্যকে বিভিন্ন পর্যায়ে সমৃদ্ধ করেছে। তাদের অসংখ্য কাজ পশ্চিমবঙ্গ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খ্যাতি অর্জন করেছে।
নারী শিল্পী: মালা পাল, চায়না পাল, মিনতি পাল, সোমা পাল, কাঞ্চী পাল, চম্পারাণী পাল
১৯৯০-এর দশক থেকে কুমারটুলিতে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বেড়েছে। মালা পাল আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন এবং তার তৈরি প্রতিমা ইউরোপ, আমেরিকা সহ নানা দেশে রপ্তানি হয়েছে।





