প্রাচীন ধারা ও বিকাশ
দুর্গা পূজা বঙ্গের অন্যতম বৃহৎ ও জনপ্রিয় হিন্দু উৎসব। এর সূচনা নিয়ে নানা মত প্রচলিত। ঐতিহাসিক দলিলপত্র ও প্রাচীন গ্রন্থ ঘেঁটে পাওয়া যায় যে, ১১শ শতাব্দীতেও দুর্গার আরাধনা অনুষ্ঠিত হত, তবে তা মূলত চৈত্রী দুর্গা বা বসন্তকালে পালিত হতো। পরবর্তী সময়ে পূজার মূল সময়স্থানান্তর ঘটে শরতে—পুরাণ মতে, শারদীয় দুর্গাপূজার প্রচলন প্রথম করেছিলেন শ্রীরাম, রাবণবধের পূর্বে দেবীর আশীর্বাদলাভের উদ্দেশ্যে।
১৭শ শতাব্দীতে, আনুমানিক ১৬০০ সালের কাছাকাছি, বাংলায় অভিজাত শ্রেণি বিশেষত রাজারা ও জমিদাররা গৃহস্থালি আয়োজন হিসেবে দুর্গাপূজা জনপ্রিয় করে তোলেন। ঐতিহাসিকদের মতে, ১৬১০ সালে কলকাতার সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবার তাঁদের বারিশা অঞ্চলের বাড়িতে দুর্গাপূজা শুরু করেছিলেন, যার ধারাবাহিকতা আজও বজায় আছে এবং যা “বারিশা বাড়ির পুজো” নামে সুপরিচিত। আবার ১৭৫৭ সালে শোভাবাজার রাজবাড়িতে নবকৃষ্ণ দেবের আয়োজন বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে।
সামাজিক পরিবর্তন ও গণপূজার আবির্ভাব
উনিশ শতকের প্রথমার্ধে কলকাতার দুর্গাপূজা কেবল ধর্মীয় উৎসব হিসেবেই নয়, ধন-প্রাচুর্য প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই সময়ে ‘বারোয়ারি’ বা সর্বজনীন পূজার সূচনা হয়, যার মাধ্যমে দুর্গাপূজা পারিবারিক পরিসর থেকে বেরিয়ে বৃহত্তর সমাজের উৎসবে পরিণত হয়। ১৯২০-এর দশকে রাস্তার মোড়ে প্যান্ডেল নির্মাণ, থিম-ভিত্তিক সজ্জা এবং গণ-আয়োজনের ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজনৈতিক চেতনা, জাতীয়তাবাদ এবং বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে এই উৎসব গভীরভাবে যুক্ত হয়।
২০২১ সালে, ইউনেস্কো দুর্গাপূজাকে ‘Intangible Cultural Heritage’ বা অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।
বেদ, উপনিষদ ও পুরাণে দুর্গা – মিথ ও দর্শন
বৈদিক ও উপনিষদিক উল্লেখ
ব্রাহ্মণ্য যুগের সাহিত্যে দুর্গার স্পষ্ট উল্লেখ খুব একটা নেই, তবে রিগ্বেদের একাধিক সূক্তে (৪.২৮, ৫.৩৪, ৮.২৭, ৮.৪৭, ৮.৯৩, ১০.১২৭) ‘দুর্গা’ শব্দটি প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে—বিশেষত ‘অগ্নি দুর্গা’ রূপে, যা রক্ষাকর্ত্রী শক্তির প্রতীক।
‘দুর্গা সুঃক্ত’ অগ্নিদেবীকে দুর্গাময়ী ও আশ্রয়দাত্রী হিসেবে বন্দনা করে। রিগ্বেদের ‘দেবী সূক্ত’-এও এক সর্বব্যাপী নারীত্বশক্তির উল্লেখ আছে, যা সৃষ্টির উৎস ও পালনকর্ত্রী।
‘দেবী উপনিষদ’-এ দুর্গাকে চূড়ান্ত ব্রহ্মরূপে ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি সমগ্র সৃষ্টির আদিশক্তি, সব দেবতার শক্তির উৎস, জ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দু এবং প্রকৃতি ও পুরুষের স্রষ্ট্রী। উপনিষদে দেবী নিজেকে এভাবে বর্ণনা করেন—“আমি রুদ্র, বসু, আদিত্য ও বিশ্বদেবদের সঙ্গেই আছি; আমি সবকিছু ধারণ করি, বিশ্বমায়ায় আমি প্রবিষ্ট।”
মহাভারতে দুর্গা
মহাভারতে (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ-৫ম শতাব্দী) দেবী দুর্গার অন্যতম উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি পাওয়া যায় কুরুযুদ্ধের প্রাক্কালে, যখন অর্জুন তাঁর পূজা করেন। সেখানে দেবী ‘ত্রিভুবনেশ্বরী’ ও ‘দুর্গা’ রূপে অভিহিত হন। ‘দুর্গা স্তব’-এ তাঁকে শত্রুবিনাশিনী, অজেয় শক্তিস্বরূপা ও বিশ্বশাসনকর্ত্রী বলা হয়েছে।
দুর্গা সপ্তশতী / দেবী মহাত্ম্য
দুর্গার আধ্যাত্মিক ও দর্শনভিত্তিক পূজার প্রধান গ্রন্থ হল ‘মার্কণ্ডেয় পুরাণ’-এর অন্তর্ভুক্ত দেবী মহাত্ম্য বা ‘দুর্গা সপ্তশতী’। এতে ১৩টি অধ্যায়ে মোট ৭০০ শ্লোক রয়েছে, যেখানে মহিষাসুর বধ, শুম্ভ-নিশুম্ভের বিনাশ, মহাকালী, মহালক্ষ্মী, মহাসরস্বতী রূপে দেবীর প্রকাশ—সবই বর্ণিত হয়েছে।
এখানে দেবীই সৃষ্টির আদি ও অন্ত, সুবিচার ও চূড়ান্ত সত্যের প্রতীক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুর্গার চিত্র মানুষের মনে একাধারে শক্তি, মাতৃত্ব ও ভয়ঙ্কর রূপের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে।
শ্রীমদ্ দেবী ভাগবত পুরাণ
শাক্তদর্শনের অন্যতম প্রধান সূত্র শ্রীমদ্ দেবী ভাগবত পুরাণ। ১২ স্কন্ধে বিস্তৃত এই গ্রন্থে দুর্গাকে ‘পরম নির্গুণ ব্রহ্ম’ বলা হয়েছে। পুরাণ মতে, প্রথমে নিরাকৃত নিবিড় শক্তি ছিলেন দেবী; পরে সত্ত্ব, রজ, তম—এই তিন গুণে প্রকাশিত হয়ে সৃজন, সংরক্ষণ ও সংহার নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁকে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরের জননী এবং ‘জগজ্জননী’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে।
এই পুরাণ আরও জানায়, সকল দেবতা ও দেবী—এমনকি দুর্গাও—চূড়ান্ত সর্বশক্তিমান ব্রহ্মেরই প্রকাশ। মোক্ষপ্রাপ্তির একমাত্র উপায় হল এই পরম ব্রহ্মের আরাধনা।
বাংলায় দুর্গা পূজা : সংস্কার, সমাজ ও সংস্কৃতি
দুর্গা পূজা কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারারও অবিচ্ছেদ্য অংশ। ব্রিটিশ আমলে এটি ছিল মূলত জমিদার ও উচ্চবিত্তের ব্যক্তিগত আয়োজন। কিন্তু ১৯১০ সালের ২৩ অক্টোবর প্রথম বারোয়ারি পূজা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই এটি সর্বস্তরের মানুষের উৎসবে রূপ নেয়।
বিশ শতকে পূজা শিল্প, সংস্কৃতি এবং সামাজিক মেলবন্ধনের ক্ষেত্র হিসেবে বিকশিত হয়। কলকাতার কুমারটুলির শিল্পীরা প্রতিমা গঠনে বিশ্বখ্যাতি অর্জন করেন; আলোকসজ্জা, থিম-ভিত্তিক প্যান্ডেল ডিজাইন ও শিল্পমাধ্যমের সৃজনশীলতা আন্তর্জাতিক পরিসরেও সমাদৃত হয়। আজকের দিনে দুর্গাপূজা একাধারে ঐতিহ্য, শিল্প, ব্যবসা, পর্যটন ও সামাজিক সম্প্রীতির মিলনমেলা।
উপসংহার
বৈদিক যুগের প্রতীকী শক্তি থেকে আধুনিক কলকাতার থিম-প্যান্ডেল পর্যন্ত—দুর্গার মাহাত্ম্য সময়ের স্রোত পেরিয়ে সমান উজ্জ্বল। তিনি একইসঙ্গে আশ্রয়দাত্রী, অজেয় শক্তি, মাতৃত্বের প্রতীক ও শুভের প্রতিরূপ। ইতিহাস, পুরাণ ও আধ্যাত্মিকতার এই অনন্য মেলবন্ধন দুর্গাপূজাকে শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং বাঙালির আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক গৌরবের চিহ্ন রূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে।





