top of page

নবপত্রিকা ও দুর্গাপূজা: বাংলার প্রাণের এক অনন্য মিলন

  • Aug 31, 2025
  • 2 min read

Updated: 4 days ago

শারদীয় দুর্গাপূজা বাংলার মানুষের হৃদয়ে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এই পূজার সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর ও সাংস্কৃতিক দিকগুলোর মধ্যে নবপত্রিকা পূজা অন্যতম। নবপত্রিকা মানে নয়টি গাছের সম্মিলিত আকার, যা বাংলার প্রকৃতি ও পৌরাণিক কাহিনীর এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সপ্তমীর সকালে নদী কিংবা জলাশয়ে নবপত্রিকার পবিত্র স্নান ছাড়াই দুর্গাপূজা পূর্ণাঙ্গ হয় না।

নবপত্রিকা গঠনে রয়েছে কলাগাছ, কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধান—এই নয়টি উদ্ভিদ একসাথে বাঁধা হয় শ্বেত অপরাজিতার লতা ও বেলপাতার লতা দিয়ে, তারপর লালপাড় সাদা শাড়িতে সাজিয়ে দেবীর ডান পাশে বসানো হয়। পুরাণ অনুসারে, এই নয়টি গাছের প্রতিটি গাছ একটি দেবীর শক্তির প্রতীক। উদাহরণস্বরূপ, কলাগাছ ব্রাহ্মাণীর প্রতীক, কচু কালীকূপী, হলুদ সবল দুর্গাদেবীর প্রতিনিধি আর ধান লক্ষ্মী দেবীর প্রতীক। তাই নবপত্রিকা পূজা দুর্গার নবরূপের আরাধনাও বটে।

নবপত্রিকার স্নানকে বাংলার কৃষি ও প্রকৃতির এক মহোৎসব বলা যায়। কৃষিভিত্তিক বাংলার মানুষের কাছে নবপত্রিকা শুধু আরাধনা নয়, বরঞ্চ প্রকৃতিকে সম্মান জানানো, ফলনশীলতা ও শুভতা অর্জনের আশীর্বাদ। এই পূজার মাধ্যমে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের গভীর আত্মিক সম্পর্ক প্রকাশ পায়।

নবপত্রিকা পূজার আচার যেমন অত্যন্ত জটিল, তেমনি তা ত্যাগ, ভক্তি ও প্রাকৃতিক সংহতির এক অভিনব উদাহরণ। সপ্তমীদিন সকালে নবপত্রিকাকে পুরোহিত কাঁধে নিয়ে নদীতে স্নান করানো হয়, তারপর শাড়ি পরিয়ে গণেশের পাশে স্থাপন করা হয়। এটি গণেশ ঠাকুরের বধূরূপে জনপ্রিয় হওয়া “কলাবউ” নামেও পরিচিত। এই আত্মনিৰ্বাণের মধ্যে বাংলার আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ছোঁয়া স্পষ্ট।

আজকের যুগে নবপত্রিকা পূজা প্রাচীন ঐতিহ্য ও পরিবেশ সচেতনতার এক মিলনস্থল। গ্রামীণ ও শহুরে সংস্কৃতির মেলবন্ধন, নারীশক্তির পুনর্জাগরণ ও প্রকৃতির সঙ্গে বন্ধুত্ব এখানে প্রকাশ পায়। নবপত্রিকা আরাধনার মধ্যদিয়ে দুর্গাপূজার পবিত্রতা ও সজীবতা প্ৰতিফলিত হয়, যা বাংলার মানুষের আত্মীয়তা, আস্থা ও সংস্কৃতিকে যুগে যুগে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে।

নবপত্রিকা গঠনে থাকে নয়টি উদ্ভিদ—কলাগাছ, কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধান। প্রতিটি উদ্ভিদের সঙ্গে বিভিন্ন দেবীর শক্তির সংযোগ কল্পনা করা হয়েছে:

  • কলাগাছ- ব্রহ্মাণী,

  • কচু- কালিকা,

  • হলুদ- উমা,

  • জয়ন্তী- কার্তিকী,

  • বেল- শিবা,

  • ডালিম- রক্তদন্তিকা,

  • অশোক- শোকরহিতা,

  • মানকচু- চামুণ্ডা,

  • ধান- লক্ষ্মী

নবপত্রিকা আসলে নবদুর্গার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি বেলপাতার মতো স্তনযুগলের আদলে শ্বেত অপরাজিতার লতা ও বিভিন্ন গাছ একসাথে বেঁধে তৈরি করা হয়। নবপত্রিকা पूजा সাধারণত গণেশের ডান পাশে করা হয়, যা লোকমুখে গণেশের স্ত্রী কলাবউ নামে পরিচিত। তবে প্রকৃতপক্ষে এটি দেবীর নয়টি শক্তির সম্মিলিত প্রতিভূত রূপ। যদিও শাস্ত্রে নবপত্রিকার সরাসরি উল্লেখ নেই, তবুও কৃত্তিবাসী রামায়ণে নবপত্রিকা পূজার বর্ণনা পাওয়া যায়, যা মূলত শস্যদেবীর আরাধনার অংশ। এই আচার বাংলার কৃষিপ্রধান সমাজের উৎসব ও প্রকৃতির গভীর মিলনের পরিচয় বহন করে। কলাবউর স্নান দূষণমুক্তি ও শস্যবৃদ্ধির প্রার্থনার প্রতীক, ঠিক তেমনি নবপত্রিকার পূজার মধ্য দিয়ে দেবী ও প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক ফুটে ওঠে। একাধিক গবেষক নবপত্রিকাকে নারীরূপী শস্যদেবীর পূজারূপে চিহ্নিত করেছেন, যার মাধ্যমে প্রকৃতি, কৃষি, নারীত্ব ও পৌরাণিক একতার এক অপূর্ব উদযাপন ঘটে। অতএব, নবপত্রিকার পূজা এবং অনুষ্ঠান দুর্গাপুজোর প্রাণের মূল অংশ, যেখানে প্রকৃতির বাণী, নবদুর্গার শক্তি ও বাংলার ঐতিহ্য একত্রিত হয়ে এক অনন্য উৎসবের রূপ পায়।

পুরাণ ও কৃষিপ্রধান বাংলার জীবনের মেলবন্ধনে নবপত্রিকা পূজার তাৎপর্য প্রবল। এটি শুধু ঐতিহ্যের অংশ নয়; প্রতিটি বছরে প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে দেবীর শক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি রীতি। নবপত্রিকার স্নান থেকেই পূজার অকালবোধন, অর্থাৎ দেবীর আগমন শুরু হয় যা বাংলার জীবনের গভীর সেতুবন্ধন। দশমীতে নবপত্রিকা, দুর্গার আরাধনার সঙ্গে বিসর্জিত হয়। এতে প্রকৃতির পূর্ণতা ও দেবীর পবিত্র শক্তির একাত্মতা নিশ্চিত হয়। আধুনিক যুগেও নবপত্রিকা পুজোর মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা, সামাজিক বার্তা এবং ঐতিহ্যবাহী কৃষি সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের চিহ্ন স্পষ্ট।

bottom of page